অনুমতি নয়, সত্যটাই সাংবাদিকতার শক্তি” – সংবাদ প্রকাশে কী বলে আইন ও নৈতিকতা? —-প্রফেসর ড.  মোহাম্মদ আবু নাছের।

অনুমতি নয়, সত্যটাই সাংবাদিকতার শক্তি” – সংবাদ প্রকাশে কী বলে আইন ও নৈতিকতা? —-প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের।

“অনুমতি নয়, সত্যটাই সাংবাদিকতার শক্তি” – সংবাদ প্রকাশে কী বলে আইন ও নৈতিকতা?
—-প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গণমাধ্যমের বিস্তারের ফলে “অনুমতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ” বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে হলে আগে অনুমতি নিতে হয়। তবে বাস্তবে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো- সত্য, যাচাইকরণ ও জনস্বার্থ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে “অনুমতি” বাধ্যতামূলক কোনো সাধারণ নিয়ম নয়। বরং তথ্য সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হলে সাংবাদিক তা প্রকাশ করতে পারেন।

সংবাদ প্রকাশে অনুমতি লাগে না, দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ঘটনা, অপরাধ কিংবা জনদুর্ভোগের মতো বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নেওয়া আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়।

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি সাংবাদিক তথ্য যাচাই করে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে।

তবে অভিযুক্তের “বক্তব্য নেওয়া” গুরুত্বপূর্ণ!
সাংবাদিকতার নৈতিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া। একে বলা হয় “Right to Reply” বা জবাব দেওয়ার সুযোগ।

অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা সাধারণত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” অথবা “একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।” এতে সংবাদটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অধিক গ্রহণযোগ্য হয়।

সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে সতর্কতা জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি বা সম্মতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। যেমন- শিশুদের পরিচয় প্রকাশ, ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ভুক্তভোগীর তথ্য প্রকাশ ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার, গোপন রেকর্ডিং প্রকাশ, ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ এসব ক্ষেত্রে অসতর্কতা গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মানহানি কিংবা আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে কোন আইন ও নীতিমালা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়, মতপ্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতা-বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আচরণবিধি-মানহানি আইন, সাইবার ও ডিজিটাল সংশ্লিষ্ট আইন, শিশু আইন, আদালত অবমাননা আইন, আইনজীবীদের মতে, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা গণমাধ্যম আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বাস্তব সাংবাদিকতায় কী অনুসরণ করা প্রয়োজন:
পেশাদার সাংবাদিকরা সাধারণত-তথ্য একাধিক সূত্রে যাচাই করেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেন, প্রমাণ সংরক্ষণ করেন, জনস্বার্থ বিবেচনা করেন, আইনি ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেন তাদের মতে, “অনুমতি” নয়, বরং “সত্যতা, যাচাই ও ভারসাম্য” সাংবাদিকতার মূল শক্তি।

সচেতনতার অভাবে বাড়ছে বিভ্রান্তি:
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে “অনুমতি লাগবে” দাবি তুলছেন। তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে তথ্য গোপন বা সমালোচনা এড়ানোর কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
তাদের মতে, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা যেমন জরুরি, তেমনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করাও গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সার সংক্ষেপ:
সংবাদ প্রকাশে অনুমতি লাগে না। তবে সত্যতা যাচাই, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং সংবেদনশীল বিষয়ে নৈতিকতা বজায় রাখা সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই পারে জনস্বার্থ ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে।

লেখক : প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের
সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক,
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ।

Loading

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *