
হযরত খান জাহান আলী (রহ.) ছিলেন পনেরো শতকের একজন মহান সুফি সাধক, সেনাপতি এবং সমাজ সংস্কারক। মূলত তিনি দক্ষিণবঙ্গে (বাগেরহাট অঞ্চলে) ইসলাম প্রচার এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
তার জীবন দর্শন এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা সরাসরি কোনো বই আকারে সংরক্ষিত না থাকলেও, তার নির্মিত স্থাপত্য, জনহিতকর কাজ এবং লোকপরম্পরায় প্রচলিত কাহিনী থেকে তার আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চেতনা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
নিচে তার দর্শনের মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. ‘খিদমতে খালক’ বা সৃষ্টির সেবা
খান জাহান আলীর দর্শনের প্রধান ভিত্তি ছিল সৃষ্টির সেবা। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ পথ হলো তার সৃষ্টির সেবা করা।
দর্শন: আধ্যাত্মিকতা কেবল তসবিহ পাঠে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তৃষ্ণার্তের জন্য দিঘি খনন করা এবং মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করাও ইবাদতের অংশ।
কর্মফল: তিনি বাগেরহাট ও তার আশেপাশে ৩৬০টি দিঘি এবং ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে।
২. অসাম্প্রদায়িক মানবিকতাবাদ
তার অন্যতম বড় দর্শন ছিল সকল ধর্মের মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তিনি যখন সুন্দরবন অঞ্চল আবাদ করেন, তখন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে সমাজ গঠন করেছিলেন। তার সময়ে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ইতিহাস পাওয়া যায় না।
৩. বৈরাগ্য নয়, বরং কর্মময় সুফিবাদ
খান জাহান আলী (রহ.) প্রচলিত অর্থে সংসারত্যাগী সুফি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ‘গাজী’ এবং ‘প্রশাসক’।
দর্শন: ইসলামি আধ্যাত্মিকতায় কর্মবিমুখতার স্থান নেই। তিনি শিখিয়েছেন যে, একজন মানুষ একই সাথে আল্লাহর অনুগত বান্দা এবং একজন দক্ষ প্রশাসক বা যোদ্ধা হতে পারেন। একে ‘সুফি-সৈনিক’ দর্শন বলা হয়।
৪. নশ্বরতা ও পরকাল চেতনা
তার আধ্যাত্মিক গভীরতা বোঝা যায় তার সমাধি সৌধের শিলালিপি থেকে। সেখানে ফারসি ভাষায় কিছু পঙক্তি উৎকীর্ণ আছে যা জীবনের নশ্বরতা তুলে ধরে। তার দর্শনের নির্যাস ছিল:
“এই পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য, তাই একে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করো।”
৫. প্রকৃতি ও পরিবেশ চেতনা
বাগেরহাটের দিঘিগুলো এবং গাছপালা রোপণের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ রক্ষার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা আধুনিক পরিবেশবাদী দর্শনের সাথে মিলে যায়। তিনি প্রকৃতিকে আল্লাহর দান হিসেবে দেখতেন এবং তা রক্ষা করাকে আধ্যাত্মিক দায়িত্ব মনে করতেন।
সংক্ষেপে তার আধ্যাত্মিক বাণীর মূলভাব:
১. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা): প্রতিকূল পরিবেশে বনাঞ্চল পরিষ্কার করে জনপদ গড়ার পেছনে ছিল অটল বিশ্বাস। ২. আদল (ন্যায়বিচার): শাসক হিসেবে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে আধ্যাত্মিক সিদ্ধির পথ মনে করতেন। ৩. ইখলাস (একনিষ্ঠতা): তার করা বিশাল স্থাপত্যগুলোতে কোথাও নিজের নামের বড়াই বা প্রচার ছিল না, সবই ছিল ‘লিল্লাহ’ (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য)।
![]()


